২৯ পেরিয়ে ৩০ এ পদার্পন করল শাবিপ্রবি

২৯ পেরিয়ে ৩০ এ পদার্পন করল শাবিপ্রবি

আজ পহেলা ফাল্গুন, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। আজ ২৯ পেরিয়ে ৩০তম বর্ষে পদার্পণ করলো দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় ‘শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’। সময়ের পরিক্রমায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলেও অনেক কিছুতেই প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ এই পথচলায় এরই মধ্যে গবেষণা, উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশে বিদেশে অর্জন করেছে বহু সুনাম।

১৯৮৬ সালের ২৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিত্তিস্তর স্থাপিত হলেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯১ সালের ১লা ফাল্গুন। সিলেট শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরে আখালিয়া এলাকায় ৩২০ একর জায়গায় পদার্থ, রসায়ন ও অর্থনীতি এই ৩টি বিভাগে ১৩ জন শিক্ষক ও ২০৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে শাবিপ্রবি। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৬টি অনুষদের অধীনে ২৭টি বিভাগে প্রায় অর্ধসহস্রাধিক শিক্ষক এবং সাড়ে এগারো হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া দুটি ইন্সটিটিউও রয়েছে। আরেকটি অনুষদের অধীনে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজসহ পাঁচটি অধিভুক্ত মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। এতে পাঁচ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন। তবে সময়ের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আবাসন কিংবা অবকাঠামোগত সংকট খুবই প্রবল প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ৫ টি আবাসিক হল রয়েছে। এছাড়া দুটি প্রশাসনিক ভবন, ছয়টি একাডেমিক ভবন, একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ইউনিভার্সিটি ক্লাবসহ কয়েকটি ভবন রয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসটি এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পাসের ‘এককিলো রোড’, বঙ্গবন্ধু চত্বর, গোলচত্বর, চেতনা একাত্তর, সুবিশাল ত্রিকোণাকার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবন, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া খ্যাত ছোট ছোট পাহাড়ের টিলা, পাহাড়ের উপর গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার দেখে যে কারো প্রাণ জুড়াবে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শুরুর দিকের পথচলায় হাল ধরেছিলেন প্রথম উপাচার্য ড. ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী আর বর্তমানে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। এছাড়া অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রবীণ শিক্ষকের অবদান রয়েছে প্রতিটি পরতে পরতে।  

২৯ বছরের এই পথচলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নানা অর্জন ও সুনাম কুড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে আছেন এর দক্ষ গ্র্যাজুয়েটরা। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসভিত্তিক ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। যা বর্তমানে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে রয়েছে। দেশের প্রথম সেমিস্টার পদ্ধতিতে পাঠদান শুরু, প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ‘একুশে বাংলা কিবোর্ড’, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রথম ভর্তি প্রক্রিয়া চালু, প্রথমবারের মতো ‘ননলিনিয়ার অপটিকস’ পদ্ধতিতে রক্ত পরীক্ষা করার মাধ্যমে দ্রুত ক্যান্সার শনাক্তকরণ, বাংলায় কথা বলতে পারা ও পায়ে হাঁটতে পারা রোবট ‘লি’ ও রোবট ‘রিবো’র মতো বিভিন্ন অবদানের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ স্থানে জায়গা করে নিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু গবেষণায় নয়, দেশে বিদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতাতেও নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত বছর ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০১৮’ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৭৯টি দেশের ২ হাজার ৭২৯টি টিমের সাথে লড়াই করে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকে তাঁক লাগিয়ে দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘টিম অলিক’। নিজস্ব ডোমেইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ই-মেইল সার্ভিস চালু, অনলাইনে ট্রান্সক্রিপ্ট উত্তোলনের সুবিধা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে উপস্থিতি চালুতেও প্রথম স্থানে রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও পদার্থ অলিম্পায়াডসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ পদক ও রৌপ্য পদক কুড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগীতা এসিএম আইসিপিসিতে টানা সাত বার অংশ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রোগ্রামাররা। দেশের তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে অবদান রাখায় ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর আইসিটি অ্যাওয়ার্ড অর্জন পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। সর্বশেষ চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি দেশের সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো দেশসেরা ‘ডিজিটাল ক্যাম্পাস অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে শাবিপ্রবি।

একাডেমিকর পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকে মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বে গুনাবলি করে তোলার জন্য রয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস অনুমোদিত ৫৫টি সংগঠন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানা ও গবেষণার জন্য রয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার’। এছাড়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণার জন্য রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু গবেষণা সেল’। এছাড়া সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গতিশীল রাখতে নাট্যবিষয়ক সংগঠন ‘দিক থিয়েটার’, ‘থিয়েটার সাস্ট’, সঙ্গীত বিষয়ক ‘নোঙর’, ‘রিম’, আবৃত্তি বিষয়ক ‘মাভৈঃ আবৃত্তি সংসদ’, বির্তক বিষয়ক ‘শাহজালাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি’, ‘সাস্ট স্কুল অব ডিবেট’, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ‘শাহজালাল ইউনিভার্সিটি স্পিকারস ক্লাব’, ক্যারিয়ার বিষয়ক ‘সাস্ট ক্যারিয়ার ক্লাব’, ‘গ্রাজুয়েট ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক- জিডিএন সাস্ট’ বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য ‘সাস্ট সায়েন্স এরেনা’, ‘বিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা’, ‘বাইনারি’, ‘রোবো সাস্ট’, খেলাধুলায় পারদর্শী করে তুলতে ‘স্পোর্টস সাস্ট’ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও অসহায় মানুষদের পাশে থাকার প্রত্যয়ে তৈরী ‘স্বপ্নোত্থান’, ‘কিন’সহ বিভিন্ন সংগঠন। এসব সংগঠনের কার্যক্রমে সারাবছর ক্যাম্পাস থাকে মুখরিত ও প্রানবন্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনসমূহের পাশাপাশি এখনও বিভিন্ন সমস্যা রয়ে গেছে। আবাসিক সংকট, পরিবহন সংকট ও একাডেমিক ভবন এখন বড় সংকট হয়ে দাড়িয়েছে। তবে অচিরেই এসব সংকট নিরসন হবে বলে প্রত্যাশা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৯৫০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে শাবিপ্রবি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রোল মডেল। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে অঙ্গীকার হবে সবাই মিলে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার জন্য কাজ করে যাবো। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা, কর্মচারীদের শুভেচ্ছা জানান তিনি।

তবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতবারের মতো এবারও সাদামাটা কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় প্রশাসনিক ভবন-২ এর সামনে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলন, পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল ১০টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকলের অংশগ্রহণে আনন্দ র‌্যালি এবং পরবর্তীতে মুক্তমঞ্চে কেক কাটা হয়।