সুন্নিদের অনৈক্য, সাম্রাজ্যবাদের তোষণ ও কট্টরপন্থাই ছিল সুলাইমানির বড় অস্ত্র

সুন্নিদের অনৈক্য, সাম্রাজ্যবাদের তোষণ ও কট্টরপন্থাই ছিল সুলাইমানির বড় অস্ত্র

‘ঢাল নাই, তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার’ এমন একটি প্রবাদ বাঙালী সমাজে প্রচলিত আছে। যদিও ঢাল-তলোয়ারের যুদ্ধের যুগ বহুদিন আগেই ফুরিয়ে গেছে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্ত:মহাদেশীয় যুদ্ধও খুব একটা নেই। দেশে দেশে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রাম থাকলেও তাতে সমরবিদদের ভূমিকা সামনে আসেনি। মূলত, সেসব দেশের রাজনৈতিক নেতারাই এসব যুদ্ধের কৃতিত্বের দাবিদার। সম্ভবত, কাশেম সুলাইমানি ছিলেন এক্ষেত্রে বড় একটি ব্যতিক্রম। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ‍অধীনে সমরনীতির কারণে বহুল আলোচিত। যিনি কখনও রাজনৈতিকভাবে পদ-পদবীতে যেতেও আগ্রহী হননি। 

সুলাইমানির সফলতার ‍ফল ইরান ভালোভাবেই পাচ্ছিল। বিরোধীরা ইরানের ধারেকাছে যাতে আসতে না পারে সেজন্য সমরনীতির প্রভাব তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ইরানের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে। সুলাইমানি প্রধানত তিনটি সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন। প্রধানত, দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামাস ও হিযবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলোকে সহযোগিতা করেছে ইরান। যে কারণে আরব বিশ্বে ইহুদীবাদ বিরোধী ক্ষোভকে তিনি হাতিয়ার বানাতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপস্থিতির কারণে জনগণের একটি ক্ষোভ ছিল। তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ইরানের বিপ্লবী সরকার একধরনের সমর্থন পেয়েছে। তৃতীয়ত, সুন্নিদের মধ্যে বিভক্তি সুযোগ করে দিয়েছে শিয়া প্রধান ইরানকে। 

অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সভুক্ত (ওআইসি) ৫৭টি রাষ্ট্রের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি রাষ্ট্রে শিয়ারা সংখ্যাগুরু। যার মধ্যে ইরাক-ইরানই সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। এর বাইরে বাহরাইন, আজারবাইজান রয়েছে। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে ইয়েমেনও রয়েছে এই তালিকায়। সাদ্দাম হোসাইনের পতনের পূর্ব পর্যন্ত ইরাক সংখ্যালঘু সুন্নিদের দ্বারাই শাসিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সিরিয়া। সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও দেশটি শাসিত হয়েছে শিয়াদের দ্বারা। তবে বিপ্লবোত্তর ইরানের দ্বারা শিয়াদের ক্ষমতার প্রভাব এখন ইরান, ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া পর্যন্ত পরিবেষ্টিত। বলা যায়, সৌদি আরব এখন অন্তত দুদিক দিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই রয়েছে। শুধু তাই নয়, সাম্রাজ্যবাদের দোসর ইসরাইলও এখন ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। 

স্বাভাবিকভাবেই সৌদি আরব ও ইসরাইলের জন্য সামনের দিনগুলোতে ইরান একটি মাথাব্যথার কারণ। যেই ব্যাথা ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছিল ইরানের আল-কুদস বাহিনীর প্রধান কাশেম সুলাইমানি। ইরান যেমন পরিকল্পিতভাবে তার শক্তি ‍বৃদ্ধি করেছে, সুন্নি অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলো ছিল তার বিপরীত। বিশেষ করে দুই শক্তিশালী সুন্নি রাষ্ট্র সৌদি আরব ও তুরস্কের নীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আগ্রাসী নীতির কারণে সুন্নি অধ্যুশিত কাতারকে দ্বারস্থ হতে হয়েছে ইরান-তুরস্কের। যে কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের বড় একটি সুযোগ তাদের সামনে চলে আসে। 

ইয়েমেন মুনসুর আল-হাদী সরকারের পক্ষে প্রকাশ্যে যুদ্ধে নেমে দেশটিতে বিপন্ন মানবতার দায়ও নিতে হচ্ছে সৌদি আরবকে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তোষণের কারণেও মুসলিম বিশ্বে সৌদির ভাবমূর্তি খুব ভালো নয়। তাছাড়া ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন দমনে ইসরাইলের সঙ্গে গোপনে হাত মেলানোর অভিযোগও রয়েছে রিয়াদের বিরুদ্ধে। অথচ ইরান শিয়া হিযবুল্লাহ বা সুন্নি হামাসকে সমানভাবে সহযোগিতা দিয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও ইরানের পরোক্ষ ভূমিকা আছে। অপরদিকে মিশরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সৌদি আরব বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সর্বশেষ সুদানে ওমর আল বশিরের পতনের পর দেশটিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্তোরণের বিপরীতে সামরিক জান্তাকে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে সৌদির বিরুদ্ধে। 

তাই সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে সকল রাজতন্ত্র, আমিরতন্ত্র, বাদশাহীতন্ত্র, সামরিকতন্ত্রকে সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ আছে। যেই শাসকদের কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তোষণ এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রতি সহমর্মিতা। তাই মধ্যপ্রাচ্যে বড় সংখ্যক সুন্নি জনগণ এই রাজতন্ত্র, আমিরতন্ত্র বা সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিল। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সকল প্রতিরোধ আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সহযোগিতার মাধ্যমে ইরান শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছে।

তাছাড়া ইসলামিক স্টেট-আইএস ও আল-কায়েদার মতো বৈশ্বিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো একইসঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সৌদি রাজতন্ত্র ও ইরানের শিয়াতন্ত্রের শত্রু। এই শত্রুদের সম্মিলিতভাবে দমনের মাধ্যমে সুন্নিরা যেমন ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে, তেমনি বিভিন্ন জায়গায় সুন্নিদের প্রভাবও কমে এসেছে। এক্ষেত্রে ইরাক ও সিরিয়া সবচেয়ে বড় উদাহরণ। 

যুদ্ধোত্তর ইরাকের গণতান্ত্রিক যাত্রা ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের টিকে যাওয়া ছিল ইরানের শক্তিবৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। আল-কায়েদা ও আইএস এর পতন হলেও সুন্নিদের একাংশ নিজেদের শাসন ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে শিয়া জেনারেল কাশেম সুলাইমানি ইরানকে শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। তাছাড়া সৌদি আরবকে বাদ দিয়ে যে কোনো উদ্যোগে ইরান অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। সেক্ষেত্রে কাতারকে রক্ষায় তুরস্কের পাশে দাঁড়িয়েছে ইরান‌। আবার মালয়েশিয়ার ডাকা ইসলামিক কনফারেন্সেও ইরানের উপস্থিতি ছিল সরব। জাতিসংঘেও দেশটির নেতারা সবসময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরব থেকেছে। এক্ষেত্রে তারা শিয়া-সুন্নি বাছবিচার করেনি। 

এমতাবস্থায় জেনারেল কাশেম সুলাইমানির হত্যা সেক্ষেত্রে মার্কিন-সৌদি-ইসরাইল ব্লকের জন্য একটি সুসংবাদই বটে। তবে চূড়ান্তভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সুন্নি শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হলে সাম্রাজ্যবাদের তোষণ থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া সৌদি সরকারের সামনে কোনো বিকল্প নেই। ইহুদিবাদী ইসরাইলকে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েও মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে জায়গা করে নেয়ার সুযোগ নেই সৌদির সামনে। 

সর্বোপরি আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং সৌদি আরবের শাসন ব্যবস্থার অভ্যন্তরে সীমিত আকারে হলেও জনগণের প্রতিনিধিত্বের সুযোগও তৈরি করতে হবে দেশটিকে। তবেই ওআইসিসহ সুন্নি ব্লকে সৌদি ভাবমুর্তি পুনরুদ্ধার হবে। তাতে ইরান তথা শিয়া ব্লকের প্রভাব এমনিতেই কমে আসবে মুসলিম বিশ্বে। সেক্ষেত্রে কাশেম সুলাইমানির মতো বীরদের সমরনীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রও হয়ে আসবে ছোট। সেটি করতে ন‍া পারলে কাশেম সুলাইমানির হত্যার পরও ইরানের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে কমবে না বরং ইরানের এই অগ্রযাত্রা চলতেই থাকবে। 

লেখকঃ আইনজীবী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য দৈনিক সমাচার কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।