রনিমের আকাশ

রনিমের আকাশ

সকালের আকাশের দিতে তাকিয়ে চাঁদ খোঁজা কিংবা রাতের আকাশে সূর্য কেন দেখা যাবে না তা নিয়ে অহেতু বিরক্ত হয়ে থাকা সবার কাছে অবাস্তব হলেও রনিমের কাছে অস্বাভাবিক কিছু না। এমন অনেক অবাস্তব বিষয় নিয়ে চিন্তা, ভাবনা, যুক্তি, গবেষণা যেন মানুষটার নিত্য নৈমন্তিক কাজ। কেউ কেউ ভাবে ছেলেটা পাগল। কেউ কেউ ভাবে অনেক বুদ্ধিমান। আবার কেউ কেউ ভাবে উচ্ছন্নে চলে যাওয়া মানুষগুলো এমনি হয়। রনিমের তাতে কিছু আসেও যায়ও না। সে এগুলো কিছু নিয়ে ভাবে না। তবে একেবারে উচ্ছন্নে যাওয়া মানুষ রনিম না। যদি তাই হতো এতো বড় শহরে দিব্বি কাজ কর্ম, উপার্জন করে বেঁচে আছে কি করে?

রনিমের কাছে পৃথিবীতে সব থেকে অপছন্দের কাজ হলো উপার্জন। মানুষকে কেন তার চাহিদা মেটাতে উপার্জন করতে হবে? প্রকৃতি তো বিনা পয়সায় সৃষ্টির শুরু থেকে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। গাছ কোনোদিন ফলের জন্য পয়সা চায়নি নদী চায়নি পানির জন্য দাম। ঝর্না চায়নি পানির উৎপাদন খরচ। এমনকি যেসব প্রাণী তাদের জীবন দিয়ে মানুষের খাবারের চাহিদা মেটাচ্ছে তাদের পরিবারও কোনোদিন জীবন বীমা করে টাকা দাবি করে নাই। করেনি থানায় গিয়ে খুন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ ডায়েরি। অথচ প্রকৃতির উপর মানুষ প্রতিনিয়ত ভ্যাট ট্যাক্স বসাতে ব্যাস্ত।

রনিমের সব কথায় তার সহকর্মীরা, বন্ধুরা একমত হয় না। কিন্তু কেউ তাকে খুব একটা অপছন্দ করে না। সবকিছুতে তার যুক্তিগুলো এতবেশি গভীর তাই কেউ যুক্তি খণ্ডাতে যায় না। বরং রনিমকে নিয়ে সবাই আনন্দই পায়। বিনা পয়সার এন্টারটেইনমেন্ট।

রনিমের কোনো শত্রু নেই। তার ভাষায় যদি তার কোনো শত্রু থেকে থাকে তবে তাতে রনিমের কোনো হাত নেই। শত্রুকে নিজ দায়িত্বে তার সাথে শত্রুতা করে যেতে হবে। কারণ কাউকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার মত সময় রনিমের নেই। বরং কাউকে নিয়ে যেটুক সময় নষ্ট হবে সেতুক সময় নিয়ে যদি আকাশ দেখা যায় হয়তো সময়টা আরও ভালো কাটে। রনিম বিশ্বাস করে মানুষের সব থেকে আপন বন্ধু হলো মানুষের মাথার উপরের আকাশ। জীবনের সবকিছু ছেড়ে গেলেও মাথার উপরের আকাশটা কোনোদিন তাকে ছেড়ে যায় না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একি রকম পাহারা দিয়ে রাখে।

তার এই কথায় অফিসের পিয়ন আলমগীর একমত। আলমগীর রনিমকে একদিন বলে, ভাইয়া আমি আপনার আকাশ নিয়ে ভাবনাটা অনেক ভাবছি। আপনি ঠিক কইছেন। দেখেন মানুষ যখন জন্মায়, জন্মের পর অনেকগুলো মাস বিছানায় শুয়ে থাকে। মানে আকাশের দিকে মুখ করে থাকে। যখন থেকে দাঁড়াতে শেখে তখন সে আকাশকে মাথা দেখানোর চেষ্টা করে। মানে আকাশের সাথে বেয়াদবি করে। আবার মানুষ যখন মারা যায় আকাশের দিকে তাকায়েই কিন্তু কবরে শুয়ে থাকে। আল্লাহর কি লীলা !!!

সকাল তার খুব প্রিয়। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে। আবার কোনো কোনো ছুটির দিনে সকাল দেখে ঘুমাতে যায়। সকালে উঠুক আর সকালে ঘুমাতে যাক, বাসা থেকে একটু দূরে চম্পক মামার নাস্তাটা মিস হয় না কোনোদিন। একটা ত্যালতেলে সবজি, হালুয়া আর হাতে বাড়ি দেয়া পরোটা। কী জেনো একটা জাদু আছে এই খাবারে। প্রায় দশ বছর হবে রনিম একি নাস্তা খাচ্ছে কিন্তু কখনো বিরক্তি ধরে না। বরং রনিমের মতে যত দিন যাচ্ছে খাবারটার সাথে তার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাচ্ছে। বলতে পারেন নেশা। সেদিন অফিসে রনিম তার সহকর্মীদের বলছিল- চম্পক মামার নাস্তা যে কোনোদিন নোবেল পেয়ে যাবে। কেন পাবে না, দুনিয়াতে কোথাও শুনছেন, মানুষ পরোটা খেয়ে নেশা করে?

...... আজকে ১৮ দিন হলো রনিমের কোনো খোঁজ নেই। অফিসে আসে না। বাসায় তালা ঝুলছে। চম্পক মামার দোকানেও আসে নাই। শেষ যেদিন অফিসে এসেছিলো তাকে খুব বিমর্শ দেখাচ্ছিল। কারও সাথে তেমন কোন কথা বলছিলো না। খুব চিন্তিত মনে হচ্ছিলো।

তাহলে কি আকাশ প্রিয় মানুষটা আকাশেই হারিয়ে গেলো? এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। তবে অফিসের পিয়ন আলমগীরের বিশ্বাস- চক্ষের মত চোখ থাকলে পরিষ্কার দেখা যাবে, রনিম ভাই আকাশের কোন তারাটায় মিশে আছে...