করোনা ভাইরাসের প্রভাবঃ বিশ্ব রাজনীতিতে পালাবদলের আশঙ্কা

করোনা ভাইরাসের প্রভাবঃ বিশ্ব রাজনীতিতে পালাবদলের আশঙ্কা

পৃথিবীর বুকে যত মহামারী আজ পর্যন্ত উদ্ভব হতে দেখা গেছে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় প্রতিটিই বিশ্বব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে গেছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব মহামারী’ হিসেবে ঘোষিত করোনা ভাইরাসের প্রভাবও যে বেশ সুদূরপ্রসারী হবে তা বোধকরি বলাই বাহূল্য। ইতিমধ্যেই করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর অর্থনীতিতে এর প্রভাব বেশ ভালোভাবেই পড়তে শুরু করেছে, এবং দিনশেষে এ প্রভাব যে বিশ্ব অর্থনীতিকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে তা এখন থেকেই বেশ ভালোভাবে অনুমান করা যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রেও পালাবদলের অশনী সংকেত বয়ে আনছে করোনা ভাইরাস। সিংগাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশগুলো করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকারব্যবস্থার সক্ষমতা প্রমাণ করলেও ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইরানের মত দেশগুলো সঠিক সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ায় অনেকাংশেই জনগণের আস্থা হারিয়েছে, ফলে এসব দেশের  রাজনীতিতে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। চীন প্রথমদিকে করোনা নিয়ন্ত্রণে অদক্ষতার পরিচয় দিলেও সময় গড়ানোর সাথে সাথে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে থাকলে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিতে পেরেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। কিন্তু করোনা মোকাবেলায় অযোগ্যতা ও মন্থর সাড়া প্রদানের মাধ্যমে বিশ্ব নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে মোটামুটি ব্যর্থই হয়েছে বলা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবছর ইনফ্লয়েঞ্জা এবং সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুর একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন এবং করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারী ছুটি প্রদানের অনিচ্ছার কথা তুলে ধরে করোনা ভাইরাসকে এসব নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার মতই সাধারণভাবে গ্রহণ করার তাগিদ জানান। করোনা ভাইরাস মোকাবেলার কার্যক্রমের চেয়ে মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার দিকে ট্রাম্পের নজর বেশি থাকার বিষয়টিতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেদেশের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলের নেতারা। তাদের ভাষ্যমতে ট্রাম্পের এই অদূরদর্শী ও স্বেচ্ছাচারী নীতি আমেরিকার জনগণের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে, যা আমেরিকার রাজনৈতিক পালাবদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সম্প্রতি আমেরিকার পলিটিকো ম্যাগাজিন সেদেশের ত্রিশের অধিক সচেতন নাগরিকের উপর করোনা পরবর্তী প্রভাব সম্পর্কে একটি জরিপ চালায়, জরিপে যে বিষয়গুলো উঠে আসে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের অসচেতনতা সরকারের প্রতি জনগণের একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করছে, যা দেশটিতে রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। অপরদিকে ইরানে করোনা সংক্রমণের হার বর্তমান প্রেক্ষিতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক, ইরানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোতেও এ ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। ইরানের সরকার দীর্ঘদিন ধরে জনগণের আস্থা রাখতে ব্যর্থ বলে পরিগণিত হচ্ছিলেন, সেই সাথে করোনা সংক্রমণে অদক্ষতার বিষয়টি সরকারকে আরো অজনপ্রিয় করে তুলছে। ধারণা করা হচ্ছে ইরানসহ আরো বেশকিছু দেশ করোনা ভাইরাসের ফলে মৃত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করছে না। যদিও এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে জনগণের মধ্যে আতংক কমিয়ে আনা, কিন্তু এর মাধ্যমে দেশের জনগণ বিভ্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে।  এছাড়া জাপানে শুরুতে ব্যাপকভাবে করোনা সংক্রমণ লক্ষ্য করা গেলেও পরবর্তীতে জাপান সরকার দ্রুততার সাথে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল গঠন করে এবং আরো বেশকিছু সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। পাশাপাশি জাপানে অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিক গেমসের এবারের আসরও মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে সংক্রমণ ঠেকানোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে।

করোনা ভাইরাস দেশে দেশে যেমন দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ছে, এ মহামারীকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরকারব্যবস্থার কার্যক্রমকে তেমনি চ্যালেঞ্জের মুখ ফেলে দিচ্ছে। যেসব দেশের সরকার দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে, তারাই জনগণের আস্থা বজায় রাখতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এটি বেশ ভালোভাবেই প্রতীয়মান হয় যে আমেরিকা, ব্রিটেনের মত যে দেশগুলো বিশ্ব নেতৃত্বে সামনের সারিতে ছিল তারা তাদের অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ রোধে নাগরিকদের ভাইরাস টেস্ট সহ অন্যান্য পদক্ষেপ নিতে যেমন কার্যত ব্যর্থ বলে বিবেচিত হচ্ছে, তেমনি বিশ্বের এই সংকট-কালীন সময়ে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতেও ব্যর্থতার প্রমাণ রাখছে। বর্তমানে ইতালির যে পরিস্থিতি; স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মত দেশগুলো এর মাত্র একধাপ পেছনে রয়েছে বলে মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাপান যেমন করোনা পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উঠছে, পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিংগাপুরের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। সিংগাপুরের সরকার উন্নতমানের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণকে সংক্রমণ রোধে যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক নির্দেশনা প্রদান করে; যা দেশটিতে আশঙ্কার তুলনায় সংক্রমণ কমিয়ে আনতে ভূমিকা পালন করে। চীনের সরকার অর্থনৈতিক ব্যয় ও নিরলস শ্রমের দ্বারা অবশেষে দেশটিকে সংক্রমণমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং বর্তমানে আক্রান্ত দেশগুলোকে সহায়তা করার বিষয়েও চীনকে আন্তরিক বলেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর করোনার বিরুদ্ধে একধরণের জয় বলে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে বিশ্বনেতৃত্বের পালাবদলের ক্ষেত্রে সমূহ সম্ভাবনা লক্ষ্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিংগাপুরের বিশ্লেষক কিশোর মাহবুবানির মতে, করোনা ভাইরাস পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের পরিবর্তে চীনকেন্দ্রিক বিশ্বায়ন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া মার্কিন অধ্যাপক স্টিফেন এম ওয়াল্ট ধারণা পোষণ করেছেন যে করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বনেতৃত্ব পশ্চিমাবিশ্ব থেকে পূর্বের নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে। অর্থাৎ ইউরোপের চেয়ে ক্ষমতা ও প্রভাব এশিয়াতে বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপারে ইংগিত করেছেন তিনি। বিশ্বরাজনীতির পালাবদলের ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের প্রভাব খুব সম্ভবত বেশ ভালোভাবেই পড়তে যচ্ছে, এখন শুধু দেখার অপেক্ষা যে পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়ে ঠিক কতদূর পরিবর্তন আনতে পারে এই করোনা ভাইরাস!

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

    


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য দৈনিক সমাচার কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।