করোনার পঞ্চম ঢেউ, সংক্রমণ নিয়ে শঙ্কা

করোনার পঞ্চম ঢেউ, সংক্রমণ নিয়ে শঙ্কা

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আবারও উর্ধ্বমূখি।গত কয়েক দিন ধরেই শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে।বেড়েছে শনাক্তের হারও। এ অবস্থায় শঙ্কা প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আমরা যেভাবে অসতর্ক হয়ে চলাচল করছি, তাতে হাসপাতালে রোগী বাড়তে সময় লাগবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি করোনার পঞ্চম ঢেউ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া মানুষদের করোনা টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় করোনায় কারও মৃত্যুর খবর না এলেও এসময়ে ১৬২ জনের দেহে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় করোনা শনাক্তের হার ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই মাস দৈনিক সংক্রমণ একশোর নিচে থাকলেও গত তিন দিনে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৫ মার্চ একদিনে শনাক্তের সংখ্যা ছিল একশোর ওপরে। তবে মে মাসের শেষ দিকে এসে বাড়তে শুরু করেছে সংক্রমণ।

গতকাল শঙ্কা প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, আমরা যেভাবে অসতর্ক হয়ে চলাচল করছি, হাসপাতালে রোগী বাড়তে সময় লাগবে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ আমরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু দেশে এখন আবার করোনা বাড়ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, গত একমাস দেশে সংক্রমণের হার ছিল দশমিক ৬ শতাংশ, এখন সেটা ২ শতাংশে উঠে গেছে। প্রতিদিন যেখানে দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগীর করোনা শনাক্ত হতো, এখন সেটা বেড়ে হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ জন। আমরা আশঙ্কা করছি, আমাদের যদি এই মুহূর্তে পরীক্ষা বাড়ে, তাহলে সংক্রমিতের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে।

অসতর্ক হয়ে চলাচল চলাচল না করে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে আরও সতর্ক হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রী আশা করেন সবাই সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে।

এদিকে দেশে করোনা শনাক্তের হার সাড়ে তিন শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া মানুষদের করোনা টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখি হওয়ায় এটি দেশে করোনাভাইরাসের পঞ্চম ঢেউ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন।

তিনি বলেন, ‘মার্চ মাসে করোনার চতুর্থ ঢেউ শেষ হয়েছিল। আক্রান্ত মানুষের শরীরে তিন মাস প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। তিন মাস পর তা পুরোপুরি চলে না গেলেও আক্রান্ত ব্যক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। টিকার ক্ষেত্রেও তা-ই, টিকা নেওয়ার তিন-চার মাসের মধ্যে এর কার্যকারিতা কমতে থাকে। এজন্য নির্দিষ্ট সময় পর সংক্রমণ আবারও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনার বিষয়ে শিথিলতা দেখায়নি। কিন্তু চলাফেরায় আমরা তা দেখাচ্ছি। মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব মানা- এসব যেন আমরা ভুলে গেছি। করোনা অ্যালার্ট এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।’

স্বাস্থ্য সচেতনতার তাগিদ দিয়ে অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মনজুর বলেন, ‘আমাদের জনসমাগম ও ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। বাড়ির বাইরে বিশেষ করে গণপরিবহনের চলাচলকারীদের অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। করোনাভাইরাস সংক্রামক হওয়ায় এতে একজন থেকে অন্যজন আক্রান্ত হতে পারেন। ফলে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’

দেশের প্রতিটি মানুষকেই ভ্যাকসিনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দেশের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষকে করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে আদম শুমারির মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া মানুষদের এ টিকা দিতে হবে। বুস্টার ডোজ কম লোক নিলেও সবাই যেন অন্তত প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ টিকা পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

উল্লেখ্য, দেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর ১৮ মার্চ ভাইরাসটিতে প্রথম মৃত্যু তথ্য জানায় আইইডিসিআর। দেশে এখন পর্যন্ত মোট করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৫ জন।

তাদের মধ্যে মারা গেছেন মৃত্যুর সংখ্যা ২৯ হাজার ১৩১ জন। আর ১৯ লাখ ৫ হাজার ৪১৬ জন করোনামুক্ত হয়েছেন।এ পর্যন্ত করোনা শনাক্তের গড় হার ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সুস্থতার হার ৯৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। করোনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, প্রথম ডোজ নেওয়া টিকাগ্রহীতার ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ বুস্টার ডোজের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন হয়েছে এমন সাড়ে ৪ কোটি মানুষ বুস্টার ডোজের অপেক্ষায় রয়েছেন।দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেওয়ার পর চার মাস পার হয়েছে এমন ১৮ বছর ও তদুর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের বুস্টার ডোজ দিচ্ছে সরকার। গত ১৯ ডিসেম্বর দেশে বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত মোট বুস্টার ডোজ পেয়েছেন প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ।