আম্পানঃ বাংলাদেশে নিহত ১০, পশ্চিমবঙ্গে ১২

আম্পানঃ বাংলাদেশে নিহত ১০, পশ্চিমবঙ্গে ১২

অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমফান প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে বুধবার বিকেলে ভূভাগে প্রবেশ করার পর কলকাতাসহ ওড়িস্যা ও চব্বিশ পরগনায় ব্যাপক ধ্বংসযঞ্জ চালায়। এরপর সুন্দরবনের দক্ষিণপূর্ব উপকূল দিয়ে এটি বাংলাদেশের ভূভাগে প্রবেশ করে। মুষলধারে বৃষ্টি আর সুন্দরবনের বাঁধায় ঘূর্ণিঝড় কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও এর তাণ্ডবে উড়ে গেছে অনেক ঘর, উপড়ে পড়েছে বহু গাছপালা। জানমালের ক্ষয়ক্ষতির সব তথ্য এখনো আসেনি।

বাংলাদেশের উপকূলে টানা চার ঘণ্টার বেশি সময় তাণ্ডব চালিয়েছে ঘূর্ণিঝড় আমফান।স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২০ মে) রাতে সুপার সাইক্লোন আমফান কেড়ে নিয়েছে অন্তত ১০ জনের প্রাণ। বাংলাদেশে প্রবেশের আগে আমফান কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের উড়িষ্যা ও চব্বিশ পরগনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। আমফানের তাণ্ডবে পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ১২ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাব সাতক্ষীরা থেকে পটুয়াখালী উপকূল পর্যন্ত ছিল সবচেয়ে বেশি। বুধবার রাত নয়টায় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রটি ঘণ্টায় ১৫১ কিলোমিটার গতিবেগে সাতক্ষীরা উপকূলে আঘাত করে। এ সময় ১২ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস ছিল। এর আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপে প্রথম আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়টি। সুন্দরবন বাঁধা অতিক্রম করার কারণে আমফানের তাণ্ডব কিছুটা কম হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে এখন পর্যন্ত ১০ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে পটুয়াখালীতে ২, ভোলায় ২, যশোরে ২, বরগুনায় ১, সাতক্ষীরায় ১, সন্দ্বীপে ১ ও পিরোজপুরে একজন রয়েছে।

ঘুর্ণিঝড় আমফানের প্রভাবে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় রাসেদ (৬) নামে এক শিশু ও কলাপাড়ায় শাহ আলম নামে সিপিপি’র এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন গলাচিপা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম। ভোলায় ঘূর্ণিঝড় আমফানের তাণ্ডবে পড়ে রামদাসপুর চ্যানেল ট ট্রলার ডুবে একজন নিহত হয়েছে।নিহত রফিকুল ইসলামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম এলাকায়। ঘূর্ণিঝড় আমফানের প্রভাবে চরফ্যাশন উপজেলায় সিদ্দিক ফকির (৭০) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। ঝড়ের আঘাতে সাতক্ষীরা সদর থানার কামালনগরে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।সন্দ্বীপ পৌরসভা ২ নং ওয়ার্ডে ঘূর্ণিঝড় আমফানের জোয়ারে ভেসে যাওয়া এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয়রা। নিহত যুবকের নাম মো. সালাউদ্দিন (১৮)। তিনি পৌরসভা ২ নম্বর ওয়ার্ডের হোনাজীর বাড়ির আবুল কাশেমের ছেলে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় দেওয়া ধসে শাহজাহান মোল্যা (৬০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।বরগুনা সদর উপজেলার পরীরখান বাজার এলাকায় জোয়ারের পানিতে ডুবে মো. শহীদ (৬০) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ।ঘূর্ণিঝড় আমফানের তাণ্ডবে যশোরের চৌগাছা উপজেলার চানপুর গ্রামে ঘরের উপর গাছ পড়ে মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন চানপুর গ্রামের মৃত ওয়াজেদ হোসেনের স্ত্রী খ্যান্ত বেগম (৪৫) ও তার মেয়ে রাবেয়া (১৩)।

আমফানের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়েছে খুলনাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা। ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানি বেড়ে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে বিভিন্ন এলাকার মাছের ঘের ও ফসলি জমি। এছাড়া হাজার হাজার গাছ উপড়ে পড়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে গোটা উপকূলীয় অঞ্চল। ঝড়ের আঘাতে সিডর ও আইলায় বিধ্বস্ত খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে লক্ষাধিকেরও বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় আমফান শক্তি হারিয়ে দেশের উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করে চলে গেলেও গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে রেখে গেছে ক্ষত চিহ্ন। সড়কে বড় বড় গাছ পড়ে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে।ঝড়ের তাণ্ডবে সন্ধ্যা থেকে খুলনায় বিদ্যুৎ বিছিন্ন রয়েছে প্রায় সব এলাকা। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এদিকে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আমপানের প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুসংবাদ মিলেছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ক্ষয়ক্ষতির পুরো হিসেব জানা যায়নি বলে তিনি জানান। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, বুধবার বেলা ৩টার দিক পশ্চিমবঙ্গে প্রথম আঘাত হানে আম্পান। আঘাত হানে উপকূলীয় সুন্দরবন, হলদিয়া, দিঘাসহ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বহু এলাকা। এই এলাকায় ঝড়ের গতিবেগ ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার।

আম্পানের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে কলকাতা শহর। গত ৫০ বছরে কলকাতার মানুষ এ ধরনের ঝড় দেখেনি। ইতিমধ্যে কলকাতাজুড়ে শত শত গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে গোটা শহর। গাছ ভেঙে পড়েছে অলিতে গলিতে।আমফানের তাণ্ডব ধ্বংসযজ্ঞ রেখে গেছে উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান ও নদীয়াতে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায়।