আগুনটুকু জ্বালিয়ে রাখি

আগুনটুকু জ্বালিয়ে রাখি

২০০৮ সালের পর যারা আওয়ামী লীগ কিংবা ছাত্রলীগে যোগ দিয়েছেন কিংবা সক্রিয় হয়েছেন, তারা শুধু ক্ষমতায় থাকার সুবিধাগুলোই ভোগ করেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলের রাজনীতি করা যে কতটা দুরূহ, এটি তারা অনুভব করতে পারবেন না। সুতরাং শুধু সরকারি দলের সহযোগী কিংবা ভাতৃপ্রতিম সংগঠনের রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা থেকে বিরোধী দলের হয়ে রাজনীতি করা কাউকে মূল্যায়ন করা যায় না। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে যারা ১৯৯৬ সাল থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি করা শুরু করেছিলেন, তাদের শুরুটা মসৃণ হলেও বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়ে যায়। ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়া, পরীক্ষা দিতে না দেয়া, স্থানীয়দের সহায়তায় চাঁদাবাজি করা, ইত্যাদি নানা রকমের অত্যাচার চলতে থাকে। তারপরও কিছু তরুণ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন। সরকার পরিবর্তন হলে এই অন্যায় অনিয়ম দূর হবে, এমন স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে যারা ১৯৯৬ সালের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতি করা মানুষগুলো কিসের আশায়, কিসের নেশায় রাজনীতি করেছিলেন? তখন তো ৫ বছর পর পর ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না! বিরোধী দলের রাজনীতি করার পরিণাম যেগুলো আজকে গল্প মনে হয়, সেই সময় সেটাই তো নিষ্ঠুর বাস্তবতা ছিল। যাদের নিজের মধ্যে এবং পরিবারের কারো মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আছে, কেবলমাত্র তারাই তখন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে আসতেন। সুতরাং সেই বৈরী সময়ে ছাত্রলীগ করে আসা নেতা কর্মীদের প্রতি সাধারণ মানুষের সব সময় একটি অন্য রকম শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। তেমনই একজন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন ডা. বশির আহমেদ (জয়)। বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে তিনি ডা. জয় নামেই সুপরিচিত।

ডা. বশির আহমেদ জয়ের জন্ম হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর, ১৯৭১ সালে। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে দেশ স্বাধীন হওয়ায় বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিলেন "জয়"। তার পিতা এম, এ, গনি একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মাতা বেগম দেলোওয়ারা গনি ছিলেন একজন গৃহিণী। ৫ ভাই এবং ৪ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন অষ্টম। তিনি ১৯৮৭ সালে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি এবং ১৯৮৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এর আগে তিনি ৫ম শ্রেণী এবং ৮ম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। স্কুল জীবনে তিনি একজন মেধাবী ছাত্র এবং চৌকস ফুটবলার ছিলেন।

১৯৮৯ সালে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ২১তম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হওয়ার দিন থেকেই ডা. বশির আহমেদ জয় ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন। তবে এর পিছনে কাজ করেছিল পারিবারিক বিপর্যয়ের দুঃসহ স্মৃতি। ডা. বশির আহমেদ জয়ের বড় ভাই মোশাররফ হোসেন খোকন সেই সময় বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি, চট্টগ্রামে বাংলার খেয়া জাহাজের চীফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি ১৯৭৮ সালের ১২ই ডিসেম্বর অজ্ঞাত আততায়ী দের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন। তার পরিবারের সদস্যরা বহুবার চেষ্টা করেও তার খুনের বিচার পাননি। জয়ের পিতা এবং অন্যান্য ভাইয়েরা পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার এই মেধাবী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এর হত্যার বিচার সম্পন্ন করতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষেই জয় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ মনোনীত প্যানেল থেকে ক্রীড়া সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তী দুটো ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনি যথাক্রমে ক্রিয়া সম্পাদক এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘদিন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি ছাত্রাবস্থায় যুব রেড ক্রিসেন্টের সহ সভাপতি এবং ইন্টার্ন অবস্থায় ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

৯০ এর দশকের প্রথমভাগে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রেসিডেন্ট বরিশালের আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং তার ছেলে ডা. নাছিম বিশ্বাসের নির্দেশনায় পরিচালিত ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্র শিবির ছিল। এছাড়া সেসময় ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র মৈত্রীও ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল। ক্যাম্পাসে অস্ত্র এবং স্থানীয়দের সহায়তায় ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করলেও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন সব সময়ই ছাত্রলীগের বেশি ছিল। প্রধান বিরোধীদলের ছাত্র সংগঠন হওয়ার কারণে সেসময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উপর সবচে বেশি নির্যাতন চালানো হয়েছিল। সভা-সমাবেশ করতে বাধা দেয়া, মিছিলে অতর্কিত হামলা, হোস্টেল থেকে বহিস্কার, হয়রানিমূলক মামলা, ইত্যাদি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এসবের মধ্যে থেকেও যে হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্রনেতা শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন বশির আহমেদ জয়।

ডা. বশির আহমেদ জয় ছাত্রবস্থা থেকেই অসম সাহসী ছিলেন। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায় একটি ঘটনা তার মুখ থেকেই শোনা যাক। "মেডিক্যাল এ পড়ার সময় আমার সহপাঠী এবং ঘনিষ্ট বন্ধু আক্তার নেহাল এর বাসা ছিলো পুরান ঢাকার আগামসি লেন এ। বরিশালের উদ্দেশ্যে সদরঘাট যাওয়ার পথে আগামসি লেনে ওদের বাসা হয়ে যেতাম। একদিন জানলাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনি জাতীয় বেঈমান খন্দকার মুশতাকের বাসা নেহালদের বাসার খুব কাছেই। জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যাকারীদের একজন ফাঁসির দড়িতে না ঝুলে উল্টো স্বাধীন বাংলাদেশে আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছে, এটি চিন্তা করলেই মাথায় আগুন ধরে যেতো। ভাবতাম আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এর এতো নেতা, এত কর্মী, তারা কেন এই নোংরা লোকটাকে মারতে পারে না? ফ্রিডম পার্টির ছেলেরা প্রকাশ্যে গোলাগুলি করে, আওয়ামী লীগের সভায় বোমা মারে, আমাদের ছেলেরা কেন পারে না? একদিন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। নেহালের বাসা থেকে বেরিয়ে, হাতে একটি লাঠি নিয়ে একাই মুশতাকের বাড়ির গেটে হাজির হলাম। অন্ধের মত বন্ধ গেটে লাঠি দিয়ে বাড়ি মারতে থাকলাম, গালি দিতে দিতে লাথি মারতে থাকলাম। মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ এসে হাজির হল। এর মধ্যে নেহালও কয়েকজন স্থানীয় বন্ধু নিয়ে চলে এসেছে। নেহাল বলে উঠল, "করছিস কি, বিএনপি ক্ষমতায়, এখন যদি মামলা খাস, কে বাঁচাবে? বরিশাল চল তাড়াতাড়ি"। আমার কানে অবশ্য ওর কথাগুলো ঠিকমত ঢুকছিল না। ও আমাকে টেনে ওদের বাসায় নিয়ে আসে। দেয়ালের ওপার থেকে শীর্ণ দেহের মোশতাক তার সাদা ভ্রুর কুঁচকে আমার দিকে যে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, সেই দৃশ্য আমি জীবনেও ভুলব না"।

২০০১ সালে বিএনপি-জামাত আবার ক্ষমতায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে অনেকের মতে বশির আহমেদ জয়ের উপর সরকারি দলের দমন পীড়ন শুরু হয়। এমবিবিএস পাশ করে দীর্ঘদিন চাকরি জোটেনি, বরং পুরোনো মামলাগুলোকে আবার সচল করা হয়। এক পর্যায়ে তিনি বাধ্য হয়ে ২০০৫ সালে সৌদি আরবের কিং আজিজ হাসপাতালে চাকরি নিয়ে দেশ ত্যাগ করেন। কিন্তু রক্তে যার জাতির জনকের আদর্শ, সে কি আর দেশ ছেড়ে বেশিদিন দূরে থাকতে পারেন? ২০০৮ সালে দলের সংকটময় অবস্থায় সৌদি আরবের উচ্চ মাইনের চাকরি আর বিলাসী জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এবং এসেই প্রাণের দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় ঝাঁপিয়ে পড়েন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ডা. বশির আহমেদ জয়ের মত ত্যাগী ছাত্রলীগ নেতার যেভাবে মূল্যায়ন হওয়া উচিত ছিল, বাস্তবে সেরকম হয়নি। তিনি ২০০৯ এবং ২০১২ সালের বিএমএ নির্বাচনে সেন্ট্রাল কাউন্সিলর পদে অংশ নিয়ে জয়ী হয়ে আসলেও পরবর্তীতে গ্রুপিং লবিংয়ের পঙ্কিল রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। স্বাধীনচেতা মনোভাব আর চাটুকারীতায় অভ্যস্ত না হওয়ার কারণে অধিকাংশ চিকিৎসক নেতাদের কাছেই তিনি বিরাগভাজন ছিলেন। এক ধরণের চাপা অভিমান নিয়েই নীরব থেকেছেন। একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

পারিবারিক জীবনে ডা. বশির আহমেদ জয় বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক। উনার স্ত্রী ডা. শারমীনা সুলতানা ইউনিসেফ এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিকেল অফিসার পদে যোগদান করেন। ২০১৩ সালে তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট থেকে ডি-কার্ড ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের কনস্যালটেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি তিনি একজন অনলাইন এক্টিভিস্ট হিসেবে নিরলসভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আবেগ এবং শ্রদ্ধা থেকে কিছুদিন আগে "বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ পাঠচক্র" নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করেছেন।

গত কয়েক বছর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। দূর্নীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতা পদ হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীকে দূর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রিত্ব হারাতে হয়েছে। এরকম অস্থির পরিস্থিতিতে বশির আহমেদ জয়ের মত স্বচ্ছ ইমেজের ছাত্রলীগ নেতার খুব প্রয়োজন। কারণ দেশ গড়তে হলে নেতাকে শুধু দূর্ণীতিমুক্ত হলেই চলবে না, তাকে অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ধারক বাহক হতে হবে। ডা. বশির আহমেদ জয়ের মত মুজিব সৈনিকদের মূল্যায়ন করলে আদতে আওয়ামী লীগ সরকার এবং দেশের জনগণই লাভবান হবে।

লেখকঃ ডা. শেখ সোহেলুর রহমান
মেডিকেল অফিসার, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, ঢাকা।
সাবেক শিক্ষার্থী, ২১তম ব্যাচ, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ, বরিশাল।
সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক, ছাত্র সংসদ, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ, বরিশাল।
সাবেক সহ-সভাপতি, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ শাখা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।